Breaking News

অন্ধ চোখে রঙিন ক্রিকেটকে দেখেছেন যিনি

চারপাশের এই রঙিন পৃথিবীর সকল রঙ উপভোগ করা থেকে এক মুহূর্তেই আপনি চিরতরে বঞ্চিত হয়ে যেতে পারেন, যদি আপনার চোখের জ্যোতি নিভে যায়। তাই বলা হয়ে থাকে, চোখ মানুষের অমূল্য সম্পদ। এই অঙ্গে ধরা পড়া সামান্য থেকে সামান্যতম সমস্যা আপনার রূহে কাঁপুনি ধরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমার একজন কলেজ শিক্ষকের মুখে প্রায়ই শুনেছি, ‘সৃষ্টিকর্তা কখনো কাউকে বঞ্চিত করেন না। তিনি তার কোনো সৃষ্টিকে যদি একদিকে দুর্বল করে রাখেন, তবে অন্য কোনো ক্ষেত্রে তাকে ঠিকই কোনো না কোনো বিশেষ শক্তি দান করেন।’ জিম্বাবুয়ের সেরা ধারাভাষ্যকার ডিন ডুপ্লেসি যেন তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

গত শতাব্দীর শেষার্ধে জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারেতে বাবা-মার কোল আলো করে জন্ম নেন ডিন ডুপ্লেসি। কিন্তু ধরনীর আলো দেখার আগেই চোখ দুটোকে হারাতে হয় তাকে। জন্মের সময়ই ডাক্তাররা ডিনের দুই চোখের রেটিনায় টিউমার আবিষ্কার করেছিলেন। সে সময় ডিনের পরিবারকে তারা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ‘আপনাদের ছেলে তো তিন থেকে পাঁচ মাসের বেশি বাঁচবে না।’ কিন্তু প্রবাদে আছে না, ‘রাখে আল্লাহ, মারে কে?’ চিকিৎসাবিদ্যার ভবিষ্যদ্বানী ভুল প্রমাণ করে সেই ডিন ডুপ্লেসিই ৪৩ বছর যাবত জীবন যুদ্ধে অপরাজিত ইনিংস খেলে চলেছেন।

ক্রিকেটের সঙ্গে তার এই অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্ম ১৯৯১ সালে ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর চলাকালীন সময় থেকে। রেডিওতে সেসময়কার কোনো এক ম্যাচের সরাসরি ধারাভাষ্য ডিনকে শুনিয়েছিলেন তার ভাই গ্যারি। এর আগে ক্রিকেট নিয়ে ভাইয়ের মাঝে অন্যরকম উন্মাদনা কাজ করলেও ডিনকে তা স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু সেদিনের সেই ম্যাচের ধারাভাষ্য চলাকালে মাঠ থেকে ভেসে আসা ৬০-৭০ হাজার দর্শকদের সম্মিলিত চিৎকার, কোরাস ধ্বনি আর আতশবাজি ফাটার আওয়াজ তাকে রীতিমতো মুগ্ধ করে। এরপর থেকে ক্রিকেটই হয়ে যায় তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্রিকেট নিয়ে তার পাগলামি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ছোটবেলায় নিজের পকেট খরচের টাকা বাঁচিয়ে তা দিয়ে ফোন বুথ থেকে নিয়মিত তারকা ক্রিকেটারদের কল করতেন ডিন।

এদিকে ক্রিকেট নিয়ে তার এই ব্যাপক আগ্রহ দেখে ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ে, ভারত ও উইন্ডিজের মধ্যকার ত্রিদেশীয় সিরিজ চলাকালে ইসএসপিএন ক্রিকইনফো তাদের অনলাইন রেডিও সম্প্রচারের অনুষ্ঠানে তার ছেলেবেলার বন্ধু এবং সাংবাদিক নিল মানথোপ এবং ভারতের সাবেক ব্যাটসম্যান এবং বর্তমান কোচ রবি শাস্ত্রির সঙ্গে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ডিনের সাবলীল বাচনভঙ্গি এবং ক্রিকেটীয় জ্ঞান দেখে পরে গোটা সিরিজের জন্য তাকে রেখে দেয় জনপ্রিয় স্পোর্টস পোর্টালটি। এভাবেই কমেন্ট্রি জগতে তার পথচলা। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে টিভিতেও লাইভ ধারাভাষ্যের জন্য তাকে নির্বাচন করা হয়। বর্তমানে ডিনের পরিচয় একজন ফ্রিল্যান্সিং ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং ধারাভাষ্যকার হিসেবে। জিম্বাবুয়ের একমাত্র বাণিজ্যিক রেডিও স্টেশন ‘ক্যাপিটক ১০০.৪ এফএম’-এ ‘ডিন এট স্ট্যাম্পস’ নামের একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানও পরিচালনা করেন তিনি। যেটা আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে বিরল এক দৃষ্টান্ত।

এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, চোখে না দেখেও কিভাবে একজন মানুষ ধারাভাষ্য দিতে পারেন? এই শিল্পের জন্য যে চোখের সাহায্যটা অপরিহার্য। কিন্তু আগেই বলেছিলাম, সৃষ্টিকর্তা সবার মাঝেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ দিয়ে রেখেছেন। ডিন ডুপ্লেসিও এর ব্যতিক্রম নন। সেই ছোটবেলা থেকে রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনতে শুনতে তিনি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে, এখন স্ট্যাম্প মাইক্রোফোন থেকে পাওয়া শব্দ শুনেই বলে দিতে পারেন, কে বল করলেন আর কে ব্যাট করলেন। এমনকি বোলার কোন লেন্থে বল করলেন আর ব্যাটসম্যান কোন ধরনের শট খেললেন এবং বলটি মাঠের কোথায় গিয়ে পড়লো কিংবা সেটি ফিল্ডার ক্যাচ ধরলেন কিনা, সেটাও নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারেন তিনি। যে কারণে আইসিসির নির্ভুল ধারাবিবরণী বর্ণনাকারীদের তালিকাতেও রয়েছে ডিনের নাম। এব্যাপারে তার বক্তব্য হচ্ছে, ‘স্ট্যাম্প মাইক্রোফোনগুলো আমার জন্য খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমি আমার কাজ করতে পারবো না। বল ছোঁড়ার সময় বোলারের মুখ দিয়ে যে আওয়াজ বের হয়, তা শুনে আমি বলতে পারি তিনি কে। যেমন – জিমি অ্যান্ডারসন, ব্রড কিংবা বাংলাদেশের শাহাদাত হোসেন, মাশরাফি সবার আওয়াজ আলাদা। আবার ব্যাটসম্যান যখন সুইপ শট খেলেন, তখন অধিকাংশ সময় পিচের সাথে ব্যাটের ঘষা লাগে। আবার ড্রাইভ খেলার শব্দের সাথে পুল করার শব্দ আলাদা।’

তবে কিছু কিছু ব্যাপারে ডিনকে তার সহকর্মীরা সাহায্য করে থাকেন। যেমন – স্ক্রিনে ভেসে ওঠা কোনো পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে। এছাড়া বাংলাদেশকেও তার টেস্ট অভিষেকের পর থেকে অনুসরণ করে আসছেন তিনি, ‘২০০০ সালে বাংলাদেশ যখন টেস্ট স্ট্যাটাস পেল, ঠিক তখন থেকেই আমি তাদের অনুসরণ করছি। আমিনুলের সেই অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরি এখনও আমার মনে আছে। এছাড়া হাবিবুল বাশার, আশরাফুল, সাকিব, তামিম, মোস্তাফিজের খেলা আমার ভালো লাগে। তবে বাংলাদেশিদের মাঝে মুশফিকুর রহিম হচ্ছে আমার সবচেয়ে প্রিয় ক্রিকেটার।’ অন্যদিকে ডিনকে নিয়ে বাংলাদেশি ধারাভাষ্যকার শামীম চৌধুরি মন্তব্য হচ্ছে, ‘ওর ক্রিকেটীয় জ্ঞান এতোটাই বিশাল যে, কোনো একটি তথ্য দিলেই সে সেটাকে খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। মনেই হবে না যে, একজন অন্ধ লোক ধারাভাষ্য দিচ্ছেন।’

তবে এতোকিছুর মধ্যে তার আক্ষেপও রয়েছে বেশ। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলে তাকে কখনোই অন্যান্য ধারাভাষ্যকারদের মতো মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ তার। এমনকি এতো বছর যাবত করে আসা কাজের জন্যও ন্যূনতম সম্মানীটুকু পাননি তিনি, ‘আমি মনে করি, নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আমাকে একটি সুযোগ দেওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু কখনোই আমি সেটা পাইনি।’ কিন্তু দিনশেষে ডিন প্রমাণ করে দিয়েছেন স্বপ্ন জয়ের ইচ্ছা থাকলে মানুষ যেকোনো কিছু করতে পারে, যদিও নিষ্ঠুর এই সভ্যতা আপনাকে সময়ে সময়ে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবে না।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

About admin

Check Also

সাকিবের মোট সম্পদের পরিমাণ কত?

বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের আজকের এই অবস্থানে উঠে আসার পিছনে যে কয়জন ক্রিকেটারের বিরাট অবদান ছিলো, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *